গোয়াইনঘাটে অপহরণ ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য রুখতে জনমানুষের সোচ্চার প্রতিবাদ
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা অপহরণ ও কিশোর গ্যাংয়ের বেপরোয়া অপতৎপরতার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় সচেতন জনতা। এলাকায় ক্রমাগত আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুক্রবার (১০ এপ্রিল) জুমার নামাজের পর এক বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সালুটিকর-গোয়াইনঘাট মহাসড়কের নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় আয়োজিত এই কর্মসূচিতে স্থানীয় কয়েকশ বাসিন্দা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
সমাবেশে উপস্থিত বক্তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে বর্তমানে এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ও অপহরণের মতো ঘটনাগুলো জনজীবনকে চরম অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বিশেষ করে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবক মহলে এক ধরনের অস্থিরতা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে যা একটি সুস্থ সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলের মাধ্যমে প্রতিবাদকারীরা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান যেন অতি দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হয়। তাদের মতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত টহল জোরদার এবং সন্দেহভাজন আস্তানাগুলোতে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। অন্যথায় এই সামাজিক ব্যাধি পুরো অঞ্চলের শৃঙ্খলাকে বিপন্ন করে তুলতে পারে বলে তারা আশঙ্কা ব্যক্ত করেন।
ঘটনার বিবরণে জানা যায় যে গত শুক্রবার (৩ এপ্রিল) দুপুর ২ টা ৩০ মিনিটের দিকে শাকিল আহমেদ নামে এক তরুণকে স্থানীয় একটি নির্জন স্থান থেকে একদল কিশোর জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। অপহরণকারীরা কেবল তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং সেই পাশবিক দৃশ্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে চরম হীনমন্যতার পরিচয় দেয়। পরবর্তীকালে স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে তিনি প্রাণে রক্ষা পেলেও এই ঘটনাটি এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। ভুক্তভোগী শাকিল আহমেদ ইতোমধ্যে গোয়াইনঘাট থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেছেন।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এই বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন যে অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে। প্রশাসনের এমন আশ্বাসে এলাকাবাসী কিছুটা আশ্বস্ত হলেও তারা মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও জনগণের যৌথ প্রচেষ্টায় গোয়াইনঘাটে পুনরায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে সংশ্লিষ্ট সকলে প্রত্যাশা করছেন।
পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়া এই জনপদে যখন অল্পবয়সী তরুণরা অপরাধের অন্ধকার পথে পা বাড়ায় তখন তা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায়। শৈশব ও কৈশোর যখন নীতি ও আদর্শের বদলে হিংস্রতা আর গতির মোহে আচ্ছন্ন হয় তখন সেখানে সামাজিক সচেতনতার প্রাচীর গড়ে তোলা অপরিহার্য। আমরা এমন এক আগামীর প্রত্যাশা করি যেখানে প্রতিটি কিশোর হবে আগামীর সুনাগরিক এবং প্রতিটি জনপদ হবে অপকৃতি ও ভয়মুক্ত। অন্ধকারের সকল অপসংস্কৃতি আর কিশোর গ্যাংয়ের বিষবাষ্প মুছে গিয়ে নৈতিকতার আলোয় আলোকিত হোক প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবার এবং প্রতিটি মানুষ ফিরে পাক তার নির্ভয় যাপনের অধিকার। সাহসের সাথে এই সামাজিক অবক্ষয় মোকাবিলা করেই আমাদের গড়ে তুলতে হবে এক শান্ত ও আধুনিক বাংলাদেশ।