সমুদ্রপথে ইউরোপ যাত্রার রঙিন স্বপ্নে বিভীষিকা: জিম্মি ও নির্যাতনের শিকার ৮০ শতাংশ বাংলাদেশি
উন্নত জীবনের রঙিন স্বপ্ন নিয়ে অবৈধ পথে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার অদম্য বাসনা অনেক ক্ষেত্রেই শেষ হচ্ছে মর্মান্তিক মৃত্যু কিংবা চরম লাঞ্ছনায়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য যেখানে দেখা যাচ্ছে যে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইউরোপে যেতে চাওয়া বাংলাদেশিদের অন্তত ৬৩ শতাংশই পথিমধ্যে ভয়ঙ্কর মানবপাচারকারী চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। কেবল জিম্মি হওয়াই নয় বরং এই যাত্রায় অংশ নেওয়া প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন যা এই স্বপ্নযাত্রাকে শেষ পর্যন্ত এক ভয়াবহ মৃত্যুযাত্রায় রূপান্তর করছে। একযুগের পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে দেশ থেকে অন্তত ৭০ হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পা রেখেছেন যাদের একটি বড় অংশই এখন মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
শনিবার (১১ এপ্রিল) সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায় যে লিবিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার তালিকায় এখন শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে প্রাণ হারানো ১৮ জন বাংলাদেশির হৃদয়বিদারক সংবাদ এবং ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর ২১ জনের বেঁচে ফেরার ঘটনা এই সংকটের ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। অভিবাসন বিশ্লেষক শরিফুল হাসান এই পরিস্থিতির গভীরতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জানান যে দেশে কোনো বড় ধরনের যুদ্ধ বা দুর্ভিক্ষ না থাকা সত্ত্বেও কেন বিপুল সংখ্যক তরুণ দেশ ছাড়াকেই সাফল্যের একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন তার মূল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। মূলত পাচারকারী চক্রের প্রলোভন এবং সামাজিকভাবে বিদেশে যাওয়াকে সফলতার মাপকাঠি হিসেবে দেখার প্রবণতাই তরুণদের এই মরণফাঁদে ঠেলে দিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সিআইডি সূত্রে জানা গেছে যে মানবপাচারের সাথে জড়িত অন্তত ১৫ থেকে ২০টি ট্রাভেল এজেন্সিকে ইতোমধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সারা দেশে মানবপাচার সংক্রান্ত ৪ হাজার ৪২৭টি মামলা দায়ের হলেও তার মধ্যে মাত্র ৯০৯টির নিষ্পত্তি হয়েছে যা অপরাধীদের উৎসাহিত করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। বর্তমানে সিআইডির তদন্তাধীন ৩১৬টি মামলার মধ্যে ৩১টি সরাসরি লিবিয়াকেন্দ্রিক পাচার চক্রের সাথে সংশ্লিষ্ট। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো এই চক্রের মূল হোতারা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ের দালালরা জামিন পেয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিংবা দেশ ত্যাগ করছে যা বিচার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।
ব্র্যাকের সমীক্ষায় আরও উঠে এসেছে যে পাচার হওয়া এই তরুণদের অধিকাংশই ঢাকা মাদারীপুর ও সিলেট অঞ্চলের ১০ থেকে ১২টি জেলার বাসিন্দা। এদের প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবারকে স্থানীয় দালালরা ভালো চাকরির প্রলোভন দেখালেও বাস্তবে ৮৯ শতাংশই গন্তব্যে পৌঁছে কোনো কাজ পাননি। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ৬ হাজার ২৬০ জন নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন যারা জমিজমা ও সঞ্চয় হারিয়ে এখন চরম অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করছেন। সমুদ্রের নোনা জলে যখন তারুণ্যের স্বপ্নগুলো বিলীন হয়ে যায় এবং বিদেশের মাটির পরিবর্তে লাশ হয়ে ঘরে ফেরার মিছিল দীর্ঘ হয় তখন তা কেবল একটি পরিবারের নয় বরং পুরো রাষ্ট্রের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
জীবনের মায়া ত্যাগ করে অজানা পথে পা বাড়ানো যখন বীরত্ব নয় বরং নিছক হঠকারিতা হিসেবে প্রমাণিত হয় তখন সেখানে সচেতনতার দেয়াল গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন। দালালদের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি আর সোনালী ভবিষ্যতের মোহে অন্ধ হয়ে নিজের ও পরিবারের জীবনকে তুচ্ছ করা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আমরা এমন এক আগামীর প্রত্যাশা করি যেখানে প্রতিটি তরুণ নিজ দেশেই তার মেধা ও শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন পাবে এবং প্রতিটি অভিবাসন হবে বৈধ ও নিরাপদ। অন্ধকারের সকল পাচারকারী সিন্ডিকেট আর দালালের শৃঙ্খল মুছে গিয়ে জনসচেতনতার আলোয় আলোকিত হোক প্রতিটি জেলা ও উপজেলা এবং প্রতিটি মানুষ ফিরে পাক তার নির্ভয় যাপন ও সামাজিক নিরাপত্তা। সাহসের সাথে এই অবৈধ প্রবণতাকে রুখে দিয়েই আমাদের গড়ে তুলতে হবে এক সুশৃঙ্খল ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ।