ঐক্য আর মানবিকতার জয়গান: সোনাই নদীতে নির্মিত হলো স্বপ্নের সেতু
ফয়ছল আহমদ নুমান
সুনামগঞ্জের ছাতক ও সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী গাংপাড় নোয়াকুট গ্রামে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগের অবসান ঘটেছে। সরকারি কোনো অনুদান ছাড়াই স্থানীয়দের নিজস্ব উদ্যোগে এবং প্রবাসী ও এলাকার বাসিন্দাদের যৌথ অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে ‘স্বপ্নের অগ্রযাত্রা’ নামের একটি দৃষ্টিসংন্দন স্টিলের সেতু। গত রবিবার (৭ জুন) বিকেলে দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বসাধারণের যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
জানা গেছে, সোনাই নদীর ওপর নির্মিত ২৬০ ফুট দীর্ঘ এবং ৭ ফুট প্রস্থের এই সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৭ লক্ষ টাকা। নদীর দুই পাড়ের ১৯ জন স্থানীয় ব্যক্তি এই অর্থ অনুদান হিসেবে প্রদান করেন। তরুণ সমাজসেবক ও উদ্যোক্তা কামরুল ইসলামের নেতৃত্বে সচেতন যুবক ও প্রবাসীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটির মাধ্যমে সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সোনাই নদী পার হয়ে প্রতিদিন কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষকে বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র ও কর্মস্থলে যাতায়াত করতে হয়। কয়েক বছর আগে একটি অস্থায়ী সেতু ভেঙে যাওয়ার পর এই ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে নদী পারাপার ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে কেবল আশ্বাস মিললেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এলাকাবাসী নিজেরাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই সেতু নির্মাণ করেন।
সেতুর উদ্যোক্তা ও ১নং ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী কামরুল ইসলাম বলেন, “এটি শুধু একটি সেতু নয়, ছাতক ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মানুষের মধ্যে যোগাযোগ, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের প্রতীক। সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘব করতেই আমরা নিজেদের দায়িত্বে এ কাজ সম্পন্ন করেছি।”
স্থানীয় প্রবীণ মুরব্বি আব্দুল জব্বার খোকন জানান, এই সেতুর ফলে কলাবাড়ী টাইটেল মাদ্রাসা, নোয়াগাঁও দাখিল মাদ্রাসা, পাড়ুয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ, টুকেরবাজার স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং এম. সাইফুর রহমান কলেজের শত শত শিক্ষার্থীর যাতায়াত এখন নিরাপদ ও সহজ হবে। এছাড়া সেতু থেকে ভবিষ্যতে লিজ বাবদ যে অর্থ অর্জিত হবে, তা নোয়াকুট বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও পরিচালনা কাজে ব্যয় করা হবে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ১নং ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াদ আলী বলেন, “সরকারি সহায়তা ছাড়াই জনগণের এমন ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়। এটি এলাকার শিক্ষা, কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
সেতু নির্মাণে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেছেন— হাজী সোনা মিয়া, হাজী মানিক মিয়া, তাজুল ইসলাম, আব্দুস সালাম, সিরাজ উদ্দীন খান, কামরুজ্জামান, মনির খান, আব্দুল মছব্বির, শফিকুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম খান (মাস্টার), আব্দুল মনাফ (মাস্টার), আজাদ মিয়া (মাস্টার), নজরুল ইসলাম, আল আমিন খান, সফিক খান, মো. কামরুল ইসলাম, ডা. জহিরুল ইসলাম বিল্লাল, রিয়াজ উদ্দীন খান, আফাজ উদ্দীন, হাসান আহমদ মঙ্গল ও শিব্বির আহমদ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন— মাওলানা শিব্বির আহমদ, সাবেক ইউপি সদস্য তাজ উদ্দিন আহমদ, আসাদ মিয়া, ইয়াছিন আলী, আলতাব মিয়া, আব্দুন নূর ও নুরুজ্জামান জামালসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
গ্রামবাসীর এই স্বাবলম্বী উদ্যোগ ইতোমধ্যে পুরো এলাকায় ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত এখানে একটি স্থায়ী ও টেকসই সেতু নির্মাণের পদক্ষেপ নেয়।