বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ৪.৭ শতাংশে ওঠার পূর্বাভাস আইএমএফের, কমছে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রকাশিত আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, আগামী বছর বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
আইএমএফের মূল্যায়নে দেখা গেছে, নানা ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও বিশ্ব অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখছে। তবে সব দেশ সমানভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সুবিধা পাওয়া দেশগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভর এবং প্রযুক্তি খাতে কম সম্পৃক্ত দেশগুলো বেশি চাপে রয়েছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলেও দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি বলে মনে করছে আইএমএফ। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ, সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন, মজুত ব্যবহার এবং জ্বালানির কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে ভূমিকা রাখছে।
তবে এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন স্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কিংবা জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে বিঘ্ন ঘটলে দাম বেড়ে যেতে পারে। এতে জ্বালানি ব্যয়ের পাশাপাশি উৎপাদন, আমদানি এবং সরকারি ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়বে। পণ্য ও সেবা উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতিও আরও বাড়তে পারে।
আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং প্রযুক্তি খাতে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হলে এসব দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া সরকারের রাজস্ব আয় ও আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হলে সাধারণ মানুষের বাড়তি ব্যয়ের চাপ কমাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। নিম্ন আয়ের এবং অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে চিহ্নিত করেছে আইএমএফ। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে অথবা নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করলে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরকারি বাজেট ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, সাইবার আক্রমণ এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনাও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলে পণ্য উৎপাদন ও পরিবহনের খরচ বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব বাজারদরে পড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্য বিরোধ, শুল্ক বৃদ্ধি এবং উৎপাদনব্যবস্থায় পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৭ সালে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। তবে বাণিজ্য উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে।
এদিকে, ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বড় অর্থনীতিগুলোতে ঋণের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো খাতে সরকারের অর্থের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে নতুন কোনো সংকট দেখা দিলে তা মোকাবিলায় অনেক দেশের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে। ঋণের ব্যয় ও সরকারি ব্যয়ের চাপ বাড়তে থাকলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে উঠবে।