জাকাত বণ্টনে বিলম্ব: আমানত রক্ষায় ইসলামী শরিয়তের বিধান ও সতর্কতা
ইসলামী জীবনদর্শনে জাকাত কেবল একটি ধর্মীয় ইবাদত নয় বরং এটি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রাপ্য অধিকার। শনিবার ১৪ মার্চ প্রকাশিত এক বিশেষ পর্যালোচনায় ধর্মতত্ত্ববিদগণ জানিয়েছেন যে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার পর জাকাত দ্রুততম সময়ের মধ্যে হকদারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া অন্যতম আবশ্যিক দায়িত্ব। পবিত্র কোরআনে নির্ধারিত খাতগুলোতে এই সম্পদ ব্যয় করার মাধ্যমে মূলত দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা হয়। ফকিহদের মতে জাকাতের অর্থ যখন মূল সম্পদ থেকে আলাদা করা হয় তখন সেটি কার্যত দরিদ্র মানুষের সম্পদে পরিণত হয় তাই এটি আটকে রাখা বা অযথা বিলম্ব করা শরিয়তের দৃষ্টিতে সমীচীন নয়।
তবে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে জাকাত বিতরণে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের প্রয়োজনে সীমিত সময়ের বিলম্ব কিছু ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন আধুনিক ফকিহগণ। যদি কোনো স্বীকৃত বা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান জাকাত সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে তবে জাকাতদাতা সেই প্রতিষ্ঠানের হাতে অর্থ তুলে দেওয়ার মাধ্যমেই তার দায়িত্ব থেকে মুক্ত হন। পরবর্তী ধাপে প্রতিষ্ঠানটি যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত হকদারদের কাছে সেই অর্থ পৌঁছে দেওয়ার আমানত বহন করে। বিশেষ করে মাসিক ভাতা প্রদান কিংবা শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো ধাপে ধাপে সহায়তামূলক বড় প্রকল্পে এই অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আলেমগণ নমনীয় মত পোষণ করেছেন।
জাকাত বণ্টনে পরিকল্পনার অবকাশ থাকলেও শরিয়ত কতগুলো কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। জাকাতের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ কোনোভাবেই অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না এবং এমন কোনো খাতে বিনিয়োগ করা যাবে না যেখানে ঝুঁকি রয়েছে। বিলম্বের কারণে যদি কোনো অতি দরিদ্র বা জরুরি প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষ কষ্টের সম্মুখীন হন তবে যে কোনো প্রশাসনিক পরিকল্পনার চেয়ে সেই তাৎক্ষণিক সহায়তাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। অর্থাৎ আমানতকারীর মূল লক্ষ্য হবে মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করা এবং কোনোভাবেই যেন হকদাররা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত না হন।
ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী জাকাত হলো সাম্যের এক সুমহান চাবিকাঠি যা বিত্তবান ও দরিদ্রের মাঝে ভ্রাতৃত্বের সেতুবন্ধন তৈরি করে। যারা এই অর্থ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকেন তারা মূলত একনিষ্ঠ আমানতদার এবং তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে সে বিষয়ে কঠোর সতর্কতা প্রয়োজন। আমরা এমন এক আগামীর প্রত্যাশা করি যেখানে প্রতিটি যোগ্য মানুষ তার প্রাপ্য অধিকার ফিরে পাবে এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠিত হবে ইনসাফ ও অর্থনৈতিক মুক্তি। অন্ধকারের এই বৈষম্য মুছে দিয়ে জাকাতের এই পবিত্র আলো প্রতিটি ঘরে শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক এবং একটি সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলুক আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।