মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রবাদে ওমরাহ যাত্রীদের ফিরতি পথে মহাবিপর্যয় ও মানবিক সংকট
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক আকাশপথ অনিরাপদ হয়ে পড়ায় সৌদি আরবে ওমরাহ পালন করতে যাওয়া হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলিম চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ৯ মার্চ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এপির এক প্রতিবেদনে জানানো হয় যে বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা বন্ধ ও ফ্লাইট বাতিলের ফলে ওমরাহ যাত্রীরা এখন নিজ দেশে ফেরা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার নাগরিকরা এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ইন্দোনেশিয়ার হজ ও ওমরাহ বিষয়ক উপমন্ত্রী দাহনিল আনজার সিমানজুন্তাক জানিয়েছেন যে বর্তমানে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৬০ জন ইন্দোনেশীয় হাজি সৌদি আরবে আটকা পড়ে আছেন। বিপুল সংখ্যক এই মানুষের অতিরিক্ত আবাসন ও যাতায়াত খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির সরকার।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইন্দোনেশিয়া সরকার আগামী এপ্রিল মাস পর্যন্ত আরও প্রায় ৬০ হাজার নাগরিককে তাদের ওমরাহ যাত্রা স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছে। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার জেদ্দায় নিযুক্ত কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ জারাইফ রাজা আব্দুল কাদির জানিয়েছেন যে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মালয়েশীয় যাত্রী বর্তমানে সৌদি আরবে আটকা পড়েছেন। তাদের সহায়তার জন্য জেদ্দায় একটি ২৪ ঘণ্টার অপারেশন রুম খোলা হয়েছে এবং বিশেষ ফ্লাইটের মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। শুধু এশীয় দেশগুলোই নয় বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকেও যারা ওমরাহ পালনের পরিকল্পনা করেছিলেন তারা বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে তাদের যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন। তুরস্ক ও কাতার হয়ে ভ্রমণের ঝুঁকি এড়াতে অনেক পরিবার শেষ মুহূর্তে তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন।
সৌদি আরবে আটকে পড়া হাজিদের জন্য এই সংকট এখন কেবল ভ্রমণের সমস্যা নয় বরং এক গভীর মানসিক যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে। অনেক যাত্রী জানিয়েছেন যে দীর্ঘ সময় হোটেলে থাকার বাড়তি খরচ বহন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ছে এবং দেশে ফেলে আসা পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। ওমরাহ যাত্রীদের এই মানবিক ও লজিস্টিক সংকট নিরসনে সৌদি কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর পবিত্র ওমরাহ ও আসন্ন হজ্জ পালনের পথে এক বিশাল অনিশ্চয়তার দেয়াল তুলে দিয়েছে যা নিরসনে বৈশ্বিক উদ্যোগ এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পবিত্র কাবা প্রাঙ্গণে ইবাদত শেষে যখন প্রশান্ত মন নিয়ে ঘরে ফেরার কথা তখন হাজারো মানুষের চোখে আজ কেবল অনিশ্চয়তার জল। যুদ্ধের দামামা যখন ধর্মপ্রাণ মানুষের সহজ সরল বিশ্বাস আর আবেগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তখন তার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কিছু হতে পারে না। সীমানার সংঘাত কেবল মানচিত্র বদলায় না বরং এটি বিচ্ছিন্ন করে দেয় একেকটি পরিবার আর তাদের স্বপ্নগুলোকে। আমরা প্রার্থনা করি মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে জমে থাকা এই বারুদের কালো মেঘ দ্রুত কেটে যাক এবং শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করুক। প্রতিটি হাজি যেন নিরাপদে তাদের প্রিয়জনদের কোলে ফিরে যেতে পারেন এবং পৃথিবীর পবিত্রতম ভূমি যেন আবার সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে শান্তির জনপদ হয়ে ওঠে। এভাবেই ভ্রাতৃত্ব আর ভালোবাসার শক্তিতে জয় হোক মানবতার আর ঘুচে যাক সকল বিরহ ও অনিশ্চয়তা।